গল্পের নামঃ বই বিলাসে আত্মা
গল্পের লেখকঃ Zakia Sultana
শব্দ সংখ্যাঃ ৯৯২ শব্দ
……………………….
ফেসবুকে একটা বইয়ের গ্রুপে কমেন্ট, সেই থেকে মেসেঞ্জারে চ্যাট করার মাধ্যমেই রায়হান ও আরিয়ানার পরিচয়।জানতে পারলো তারা দুজনেই পাশাপাশি এলাকাতেই থাকে।
বই নিয়ে চ্যাট করতে করতে তারা খুব ক্লোজ হয়ে যায়। একপর্যায় নির্দিধায় একে অপরকে ছবি দিতে শুরু করে। আরিয়ানা অসম্ভব সুন্দরি একজন মেয়ে।
একপর্যায় রায়হান অনুভব করলো সে আরিয়ানার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।আরিয়ানাকে সামনে থেকে দেখা এবং কাছে পাওয়ার জন্য সে ছটফট শুরু করলো। হঠাৎ তার মাথায় বেশ ভালো একটি বুদ্ধি আসলো
– আরিয়ানা থেকে থেকে কিছু বই ধার চাইলে কেমন হয়?ওর সংগ্রহে অনেক বই আছে,আপত্তি করবে না হয়ত। একটা ছুতো দেখিয়ে তাকে সামনে থেকে দেখতে পাবো।(মনে মনে বলল রায়হান)
আরিয়ানাকে বই ধার দেওয়ার কথা বলাতেই সে রাজি হয়ে যায়, আর রায়হানকে তার বাসার ঠিকানা দিয়ে দেয়।
আর সে তাকে সন্ধের দিকে আসতে বলে কারণ বিকেলের আগে বাবা মা বাসায় থাকে না।
রায়হান তার দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী রওনা হলো।মনের ভেতর ছটফট করছে কখন যে তাকে সামনে থেকে দেখতে পাবে! ১০ মিনিটের রাস্তা তার কাছে যেনো ১০ ঘন্টার মত লাগছে।হাটতে হাটতেই একটি বাসায় কলিং বেল চেপে দাড়ালো “বই বিলাস”।আরিয়ানা বলেছিল তার মা বাবা নাকি খুব বই পড়ে।বাড়িটাকে ছোটখাটো একটা বই বিলাস বানিয়ে রেখেছে, তাই বাড়ির নাম “বই বিলাস” দিয়েছে।
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল
– কিরে রায়হান এই সময় এই খোলা মাঠে কি করিস?
রায়হান পেছন ফিরে দেখলো তার ক্লাসমেট জিসান।
– আশ্চর্য! খোলা মাঠ তুই কোথায় পেলি?
বলতে না বলতেই দরজাটা খুলে গেলো।দরজার আড়াল থেকে আরিয়ানা তাকে ভেতরে আসতে বলছে।
– আচ্ছা জিসান, তোর সাথে পরে কথা বলবো। এটা আমার এক ফ্রেন্ডের বাসা
একটু দরকারে এসেছি।
কথাটা বলেই রায়হান ভেতরে ঢুকে গেল।
জিসান বাকরুদ্ধ হয়ে রায়হানের উধাও হওয়া দেখলো,পরক্ষনেই সে জ্ঞান হারালো।
এইদিকে রায়হান বসে আছে আরিয়ানাদের ড্রয়িংরুমের শোফায়। এতক্ষন সে ঘোরের মধ্যে ছিলো।ছবির থেকেও বাস্তবে আরিয়ানাকে আরও বেশি সুন্দর লাগে। এত অপরুপাও কি কেউ হতে পারে? মনে মনে ভাবলো সে।
হঠাৎ গায়ে ঠান্ডা কিছু পড়ার অনুভবে তার ঘোর কাটল।
– ইস্!! সরি রায়হান! আমি একদমই খেয়াল করিনি কিভাবে যেন হাত ফসকে জুসটা তোমার গায়ে পড়ে গেল। আইম রিয়েলি সরি!!
খুব অনুতপ্ততার সাথে বলল আরিয়ানা।
– ইট্ ‘স ওকে আরিয়ানা। ওয়াশরুমটা কোনদিকে?
– ওইতো ওইদিকে (আরিয়ানা হাত ইশারা করে দেখিয়ে দিল)। তুমি শার্ট ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে আসো।ততক্ষনে আমি আবার জুস বানিয়ে আনছি।
রায়হান ওয়াশরুমে চলে গেল।হঠাৎ লাইটটা বন্ধ হয়ে গেল।বেচারা অন্ধকারেই শার্ট ধুতে লাগলো।লাইটটা আবার জ্বলে উঠলো,আবার বন্ধ হয়ে গেলো।এভাবে কয়েকবার হওয়ার পর রায়হানের চোখ গেলো আয়নার দিকে।
আরিয়ানাকে দেখতে পাচ্ছে বাকা করে একটা হাসি দিয়ে তার দিকে তাকিয়া আছে। মুহর্তে রায়হানের কপাল বেয়ে কয়েক রেখা ঘাম বেয়ে গেল।চোখের পলক ফেলতেই দেখে সে নিজের নিজে তাকিয়ে আছে।
– নাহ্, ওকে বেশি ভাবতে ভাবতে আমার ইলুশন হচ্ছে।আয়নাতে দেখাটা আমার মনের ভুল।
মনেমনে কথাটা বলতেই তার চোখ পড়ল শার্ট এর দিকে। সাদা শার্টটায় রক্ত লেগে লাল হয়ে আছে। এবার সে ভয় পেয়ে গেল। দোড়ে ওয়াশরুমের দরজা খুলেতে গেলো কিন্তু অনেক টানাহেঁচড়া করেও খুলতে পারল না। আয়নাতে আবার চোখ পড়তেই দেখে আরিয়ানা হাসছে,চোখের পলকেই রায়হান আবার নিজেকে দেখছে। এবার সে চিৎকার করতে লাগলো। দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেলো। ততক্ষনে আরিয়ানা চিৎকার শুনে দোড়ে এল। রায়হানের থেকে সব ঘটনা শুনে সে হেসে উরিয়ে দিল।
– এগুলো সব তোমার মনের ভুল। কোথায় রক্ত? তোমার শার্টতো সাদাই আছে!
রায়হান নিজের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো।সত্যিইতো শার্টটা সাদাই আছে!
আরিয়ানা তাকে জুস খেতে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রায়হান যেইনা জুসটা খেতে যাবে দেখে জুসের মধ্যে আরিয়ানার ভয়ানক প্রতিবিম্ব। চোখে মুখে রক্ত মাখা,খুব আদ্ভুতভাবে হাসছে যেন এই হাসিটা এই জাগতের না! রায়হান ঢোক গিলে নিল! ভয়ে যেন তার হৃদপিণ্ড কেউ হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে এমন অনুভব হলো! সাহস করে আরিয়ানার দিকে তাকাতেই সে দ্বিতীয় বারের মত ভুল প্রমাণিত হল।জুসটি খেতে তার আর রুচি হল না,নেহাতই আরিয়ানাকে খুশি করানোর জন্য খেয়েছে।
– চলো রায়হান তোমাকে বাবা মায়ের সাজানো বই বিলাস ঘুরিয়ে দেখাই।
রায়হান আরিয়ানার পেছন পেছন তাদের বাড়িটা দেখতে লাগলো।সে খেয়াল করলো এতক্ষনেও আরিয়ানার বাবা মাকে দেখতে পাচ্ছে না সে। আরিয়ানা যেন তার মনের কথা পড়ে ফেলল
– বাবা মা উপরেই আছে।
আরিয়ানা বুকশেলফ থেকে বই নেওয়ার জন্য পেছন ফিরলো। লাল জরজেটের টপ আর জিন্স পেন্টে তার শরীরটা যেন লাল গোলাপের মত ফুটে উঠেছে।রায়হান আরিয়ানাকে কাছে পাওয়ার তীব্রতা অনুভব করলো।সে আরিয়ানার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, যেই না আরিয়ানাকে ধরতে যাবে আরিয়ানা ঘারটা পুরো ৯০ ডিগ্রী এঙ্গেলে ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো। রায়হান যেন বোবা হয়ে গেলো! এ কাকে দেখছে সে?? আরিয়ানার মুখে থেথলে যাওয়া ,চোখ,মুখ থেকে রক্ত পড়ছে । কি ভয়ানক চাহনি তার!! শুভ্র শরীরটা যেন কাটাছেড়া দাগে আর পঁচে যাওয়ার মত ফুলে উঠল।
রায়হান চোখের সামনে মৃত্য দেখতে পেয়ে পালানোর চেষ্টা করতেই দরজা নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।তার হৃদপিণ্ডটা এত জোরে জোরে আওয়াজ করছে যনে দল বেধে ঢাক বাজাচ্ছে! তখন রায়হান বুঝতে পারলো, কেন জিসান বলেছে -“এই খোলা মাঠে কি করিস?”
আরিয়ানা আস্তে আস্তে তার কাছে আসছে আর হেসে হেসে বলছে,
– আমি জানতাম বই প্রেমের সাথে তুই আমার প্রেমেও পড়বি। ঠিক বাকি বইপ্রেমী ছেলেগুলোর মতই তোর মৃত্য আমার হাতে।একএক করে তোর মতে আরেকটা আমার জালে ফাসবে আর মরবে। একটাও বই প্রেমী ছেলেকে বাচতে দিবো না!
কথাটা বলেই সে রায়হানের গলা টিপে ধাক্কা দিয়ে তাকে ফ্লোরে ফেলে দিলো।রায়হান কিছুই বলতে পারছে না তার হাত পা অবশ হয়ে আসছে।চোখে সব ঝাপসা দেখছে। উপরের দিকে তাকাতেই দেখলো সিলিং ফ্যানে ঝুলে দুইজন দম্পতী তার দিকে তাকিয়ে আছে।রায়হানের শীরা উপশীরাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাথা ফেটা রক্ত বেরুচ্ছে। হঠাৎ সে আবিষ্কার করলো আরিয়ানা তার উপরর বসে আছে বাকা করে হাসি দিয়ে তার বুকের দিকে হাত বারিয়ে টান মেরে কলিজাটা বাহির করে আনলো।তীব্র ব্যাথায় রায়হান গুঙিয়ে উঠল। পরক্ষনেই সব অন্ধকার হয়ে গেল।
( নোট: আরিয়ানার মা বাবা খুব বইপ্রেমী হওয়াতে ছোট বেলা থেকেই তাকে কম সময় দিতে পারতো। আরিয়ানাও যে বই পছন্দ করতো না, তা না। সেও টুকটাকক বই পড়তো। ফেসবুকে বইয়ের গ্রুপ থেকে একটা ছেলের সাথে পরিচয় হয় আস্তে আস্তে তা প্রেমে পরিণত হয়। কিন্তু ছেলেটা এত বইপ্রেমি ছিলো যে তাকে সময় দিতে পারতো না। একপর্যায় এতো অবহেলা সহ্য না করতে পেরে ছাঁদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে। তার মা বাবা এই সংবাদ পেয়ে গাড়ি চালিয়ে আসার সময় রাস্তাতেই এক্সিডেন্ট হয়ে মারা যায়। সেই থেকে আরিয়ানার আত্মা ফেসবুকে বই প্রেমিদের প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে সাস্তি দেয়।)
কে বলতে পারে আরিয়ানার পরের টার্গেট হয়তো আপনি?!!😈😈
Leave a Reply